লোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না...

লোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না বেকারত্ব?

চন্দন নন্দী,
শেয়ার করুন

ভারতে পার্লামেন্ট নির্বাচনের দুই মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। গো-মাংস ভক্ষণ ও গো-রক্ষার নামে মুসলমানদের উপর নির্লজ্জ হামলার খবর এখন শোনা না গেলেও কেন্দ্র ও উত্তর প্রদেশে বিজেপি এখনো ইস্যুটিকে নির্বাচনী ফায়দা হাসিলের জন্য কাজে লাগাতে তৎপর। নরেন্দ্র মোদি ও যোগী আদিত্যনাথ সরকার তাদের নিজ নিজ বাজেটে এই প্রাণীটির ‘কল্যাণে’ অর্থ বরাদ্দ রেখে ও সুনির্দিষ্ট প্রকল্প নিয়ে গো-ইস্যুকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ রূপ দিতে চাচ্ছে। এসব কাজ বিজেপি’র ভোটারদের কাছে গো-রক্ষায় দলের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরলেও অন্যদের তুষ্ট করতে পারছে না। কারণ, এই নির্বাচনী বছরে বেকারত্ব নিয়ে যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সে বিষয়ে কিছু বলছে না মোদি ও আদিত্যনাথ সরকার।

৭ নভেম্বর ইউপি’র সংসদে ২০১৯-২০ সালের বাজেট পেশকালে অর্থমন্ত্রী রাজেশ আগরওয়াল ঘোষণা করেন যে আদিত্যনাথ সরকার গ্রামীণ এলাকায় গোশালা রক্ষাণাবেক্ষণ ও নির্মাণের জন্য ২৪৭ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে। আরো ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে শহর এলাকায় কানহা গাউশালা ও পরিত্যক্ত গোআশ্রয় প্রকল্পের জন্য। দ্বিতীয় প্রকল্পটি আসলে অযোধ্যায় নতুন বিমান বন্দর নির্মাণের জন্য যে ২০০ কোটি রুপি ও পুলিশের আধুনিকায়নের জন্য ২০৪ কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য।

একই সঙ্গে রাজ্য সরকার মদের উপর সিইএসএস আরোপ থেকে ১৬৫ কোটি রুপি আয়ের পরিকল্পনা করেছে, যা পরিত্যক্ত গরু দেখাশুনার কাজে ব্যয় করা হবে। অপচয় হিসেবে বিবেচিত এসব গো-সংশ্লিষ্ট ব্যয় আসলেই প্রাণীগুলোর কল্যাণ করতে পারবে কিনা তাতে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। যখন রাজ্যটি প্রকট বেকার সংকটে নিমজ্জিত তখন এসব হটকারি প্রকল্প জনগণ সাদরে গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না।

আরো পড়ুনঃ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মোদি ও মমতা দুজনেই পুলিশ বাহিনীকে দমন করেছেন

এক সপ্তাহ আগে মোদি সরকারের ‘গো-অর্থনীতি’র অংশ হিসেবে ইউনিয়ন বাজেট পেশ করেন অস্থায়ী অর্থমন্ত্রী পীযুষ গয়াল। তখন তিনি ঘোষণা করেন যে ভারতের গো-জাতি সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য ‘রাষ্ট্রীয় কামধেনু অয়োগ’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। পার্লামেন্টে বাজেট পেশ করার আগে মন্ত্রিসভায় বলা হয়, ‘রাষ্ট্রীয় কামধেনু অয়োগ’ দেশে গোসম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গো-জাতির কল্যাণে ‘অয়োগ’ গো সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচির নীতি কাঠামো ও নির্দেশন তৈরি এবং আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। কিন্তু সরকার কিভাবে বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধ করবে সে বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করা হয়নি। বহু কোটি রুপির এই অবৈধ কাজের পেছনে যে চক্র কাজ করছে তাতে একজন সিনিয়র ইউনিয়ন মন্ত্রীর ছেলে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

মোদি ও আদিত্যনাথ সরকারের জন্য গাভী অবশ্যই সৌভাগ্যশালী প্রাণী। বিজেপি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো যেমন বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ‘গাউরক্ষা’ করত গেয়ে গিয়ে এমন আচরণ করে যা প্রায়ই মানবতা, বিশেষ করে ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মুসলমানদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। কেন্দ্রে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি আরো গুরুতর রূপ নেয়। গেজেট বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নানা শর্তের কারণে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গো-রক্ষাই সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।

বিভিন্ন রাজ্যে গো-মাংস রাখার সন্দেহে, এমনকি সাধারণ কাজে গরু নিয়ে যাওয়ার সময়ও মুসলমানরা গণপিটুনির শিকার হয়। কিন্তু ইউনিয়ন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে টু শব্দটিও করনি। বিজেপি মনে করে গাউরক্ষকদের অবাধে কাজ চালাতে ও সংখ্যালঘুদের টার্গেট করতে দিলেই হিন্দু ভোট সুসংহত হবে। কিন্তু গত বছর মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ের রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল জানিয়ে দেয় যে গোরক্ষার নামে সহিংসতায় জনগণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

এখন বলা যায়,  এই উন্মত্ততায় যত বিজেপি সমর্থক ও এক্টিভিস্টই যোগ দিক না কেন এখন বুঝা যাচ্ছে যে মুসলমান পেছনে লাগার কাজটি কর্মস্থানের সুযোগ তৈরি করেনি। সম্প্রতি যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে সেগুলো খণ্ডন করার মতো কোন যুক্তি মোদি সরকারের কাছে নেই। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিসের (এনএসএও) উপাত্তই বলে দিচ্ছে, ২০১৭-১৮ মেয়াদে বেকারত্ব ছিলো ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই রিপোর্টের লেখক অমিত বাসোলেকে উদ্ধৃত করে ভারতের এক শ্রেণীর মিডিয়ায় বলা হয়েছে, ‘এনএসএসসি-র বক্তব্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু এটা উদ্বেগজনক।’ ফলে কেন্দ্রিয় সরকারের সামনে এই রিপোর্টকে ‘ভুয়া’ বলা ছাড়া আর কোন যুক্তি ছিলো না।

আরো পড়ুনঃ ভারত রত্ন রাজনীতি: প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গ্রহণ করলেও বাঙালির বিজেপি প্রীতি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে

কিন্তু গোরক্ষার পেছনে বিজেপি শুধু একাই ছুটছে না। মধ্য প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় এসেছে এক মাসও হয়নি। এই সরকার এরই মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) ফিরিয়ে এনেছে। অতীত এই আইন ব্যবহার করা হতো জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিগ্রস্ত করছে এমন সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে। সাম্প্রদায়িক স্পর্শকাতর খানদাওয়া শহরে ‘অবৈধভাবে’ গরু জবাই করার অভিযোগে তিন মুসলমানকে আটক করা হয়েছে এই আইনে। সাবেক বিজেপি সরকরের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কতিথ গো-হত্যার অভিযোগে ২২ ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করেছিলেন।

সাবেক বিজেপি শাসনকে ছাড়িয়ে যেতে নাথ সরকার সারা রাজ্যে গো-ছাউনি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এমনকি বিলাশবহুল গাড়ির উপর সিইএসএস ধার্য করা হয়েছে ১,০০০ গোআশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের অর্থ সংগ্রহের জন্য। এ থেকে বুঝা যায় বিজেপি-বিরোধী প্রচারণাকালে সংখ্যালঘু অধিকার ও সেক্যুলারিজমের নীতিমালা রক্ষা করতে চাওয়া কংগ্রেসও একই পথে হাটছে, যা ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। এতে মনে হয় বিজেপি’র মতো কংগ্রেসেরও বেকারত্বসংকট মোচনের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই। গোরক্ষার জন্য কমল নাথ সরকারের বিজেপি-ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত নিরবতা বজায় রেখেছেন কংগ্রেসের জাতীয় সভাপতি রাহুল গান্ধী।

গোরক্ষায় চ্যাম্পিয়ন মোদি সরকার বুঝতে পেরেছে যে তার সবচেয়ে বড় সর্বনাশ ঘটাবে ব্যাপক বেকারত্ব। নির্বাচনপূর্ব জনতুষ্টির বাজেট দেখে বুঝা যায় সরকার নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আতংকিত। উচ্চ বর্ণের জন্য চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ থেকে বুঝা যায় সরকার তার সাতটি কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্য হাসিল করতে পারেনি। ২০১৮ সালের বাজেট ঘোষণাকালে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ওই টার্গেটগুলো নির্ধারণ করেছিলেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় মোদির দল এক কোটি চাকরি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। মোদি সরকার ওই লক্ষ্য পূরণের ধারেকাছেও নেই। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ প্রায় পূর্ণ হতে চলেছে। ফলে নির্বাচনে একেবারে হেরে না গেলেও এই ইস্যু দলটির জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

print
শেয়ার করুন