ভোটের সমালোচনার পর বাংলাদেশ নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন যুক্তরাষ্ট্রের

ভোটের সমালোচনার পর বাংলাদেশ নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন যুক্তরাষ্ট্রের

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর বইয়ে স্বাক্ষর করছেন শেখ হাসিনা, ছবি: এএফপি

সাম্প্রতিক নির্বাচন আয়োজন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে জোরালো অভিন্ন স্বার্থ দেখতে পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথাই ভাবছে।

পাশ্চাত্যের সাথে মোটামুটিভাবে ইতিবাচক সহযোগিতা রক্ষাকারী উদার মুসলিম জনসাধারণ-সংবলিত বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। অবশ্য এই সম্পর্ক এতটা ঘনিষ্ঠ নয় যা ওয়াশিংটনকে ব্যাপক সুবিধা দেবে।

শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে ২৮৮টিতে জয়ী হয়েছে। আর বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া (তিনি কয়েক দশক ধরে তার তিক্ত শত্রু হিসেবে রয়েছেন) যেসব অভিযোগে কারাবন্দি রয়েছেন, বিরোধীরা বলছেন সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে সংবাদপত্র নতুন বিধিনিষেধে নিয়ন্ত্রিত।

নির্বাচনের আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর উদ্বেগ প্রকাশ করে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের রাশ টেনে ধরার অভিযোগ করে অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল।

নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেখ হাসিনার সাফল্য কামনা করে একটি চিঠি দিলেও তিনি মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা করার প্রতি প্রতিশ্রুতি নতুন করে ব্যক্ত করার অনুরোধ করেন বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ইসলামপন্থীদের প্রতি তীব্র বৈরী শেখ হাসিনা জামায়াতে ইসলামীর ওপর প্রবল দমন অভিযান পরিচালনা করেছেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অভিযোগে দলটির ৫ নেতার ফাঁসি পর্যন্ত কার্যকর করেছেন।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়ে সঙ্কটটিকে আরো বড় আঞ্চলিক মাত্রায় নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রেখে তিনি ওয়াশিংটনের প্রশংসা অর্জন করেছেন। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নৃশংসতাকে জাতি নির্মূল বলে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

উইড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলার্সের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র এসোসিয়েট মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, বাংলাদেশ কার্যত একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে। তবে এই দেশটির কার্যকারিতা অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মানানসই।

তিনি বলেন, মূল কথা হলো, শেখ হাসিনাকে যুক্তরাষ্ট্র দরকারি অংশীদার মনে করে। তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে খুবই কঠোর, তিনি বেশ লক্ষণীয় মাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছেন।

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র নেতা খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে, ছবি: এএফপি

তিনি বলেন, আমি মনে করি এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তাকে একজন সমর্থক বিবেচনা করে এবং বাংলাদেশের খুবই গোলযোগপূর্ণ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী মনে করে।

আরো বড় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আশা

বাংলাদেশ সরকার নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সেইসাথে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেনি।

শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ছেলে (তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক তার উপদেষ্টাও) সজীব ওয়াজেদ বলেছেন, নির্বাচন-পূর্ব মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বক্তব্য ‘হতাশাজনক।’ তিনি এজন্য তার ভাষায় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের স্থানীয় স্টাফের মধ্যে থাকা বিরোধী দলের সমর্থকদের দায়ী করেছেন।

তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে সম্মান জানিয়েছে, সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছেন যে বছরে ছয় শতাংশের চেয়ে বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অর্থনীতিতে মার্কিন বিনিয়োগ আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, আমাদের রয়েছে বিপুল ভোক্তা বাজার। এখানে আছে প্রায় আট কোটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি বলেন, যে কয়েকটি মুসলিম দেশ তুলনামূলকভাবে সন্ত্রাসমুক্ত রয়েছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম।

সমালোচনার সীমিত সুযোগ

উন্মুক্ত, যুক্তরাষ্ট্র-বান্ধব ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশটির সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার মতো উচ্চ পর্যায়ের অবকাঠামো চুক্তিও করেনি চীনের সাথে।

বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হচ্ছে আঞ্চলিক শক্তি ও উদীয়মান মার্কিন মিত্র ভারত। দেশটি শেখ হাসিনার কট্টর সমর্থক। ফলে বিকল্প থেকে থাকলেও ওয়াশিংটনের সামনে অন্য কিছু করার সুযোগ খুব কম।

তবে বিরোধী দল আশা করছে, মার্কিন সমালোচনা ফল দেবে।

খালেদা জিযার বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটনে নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠক করেছিলেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রায়নের জন্য কাজ না করলে সম্পর্ক সীমিত থাকবে- এমনটা পরিষ্কার করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কম্বোডিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো দেশে পরিণত করেছেন।

তিনি অবাধ নির্বাচনের আহ্বান জানানো ও বিরোধী দলের উদ্বেগের বিষয়টি উল্লেখ করার জন্য মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের একটি প্রস্তাবের প্রশংসা করেন।

কবীর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হলো বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগকারী ও বৃহত্তম বাণিজ্য বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে দেখিয়ে দেয়া যে তারা স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখবে না। যুক্তরাষ্ট্র এটি না করলে সম্পূর্ণ ভুল ইঙ্গিত দেবে।

print
SOURCEএএফপি
শেয়ার করুন