কাশ্মীর থেকে তৃতীয় পক্ষকে দূরে রাখার ভারতীয় দাবি আসলে ফাঁকা বুলি

কাশ্মীর থেকে তৃতীয় পক্ষকে দূরে রাখার ভারতীয় দাবি আসলে ফাঁকা বুলি

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

ভারতের বর্তমান ও অতীতের শাসকেরা ডুগডুগি বাজিয়েই চলেছে যে কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধ নিরসনে তৃতীয় পক্ষের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ইতিহাস বলে, তৃতীয় পক্ষকে দূরে রাখার দাবি অন্তসারশূন্য।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামার নিধনযজ্ঞের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং অতীতের ঘটনাবলী সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইন্দো-পাক সঙ্ঘাত নিরসন ও প্রতিটি সঙ্কটের ক্ষেত্রে উপমহাদেশে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তৃতীয় পক্ষগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আরো পড়ুনঃ ভারতের আমলাতন্ত্র সম্প্রসারণের কথকতা

সেই ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ও ২০০০-এর প্রথম দিকে বড় ধরনের (এতে পরমাণু যুদ্ধের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল) উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ও এমনকি চীনের কিছু ভূমিকা ছিল। হস্তক্ষেপ করে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ বন্ধ করে ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাসখন্দ চুক্তির ব্যবস্থা করেছিল।১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র

গত ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও পাকিস্তানের বিমান হামলার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছিলেন, সামরিক সঙ্ঘাত এড়ানোর মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমন ও পাকিস্তানের মাটিতে থাকা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আমি পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোরেশির সাথে কথা বলেছি।

ভারতের পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাস দমন’ হিসেবে অভিহিত করে পম্পেও বলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রশ্নে সন্ত্রাসদমনে ভারতীয় পদক্ষেপের পর আমি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে আলাপকালে আমাদের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তাগত অংশীদারিত্ব ও এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার অভিন্ন লক্ষ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছি। আমি দুই মন্ত্রীকেই (কুরেশি ও সুষমা) বলেছি, পাকিস্তান ও ভারত যাতে সংযম প্রদর্শনে উৎসাহিত হয়, যেকোনো মূল্যে সহিংসতা বাড়ানো থেকে বিরত থাকে। আমি উভয় মন্ত্রীকেই সরাসরি যোগাযোগ করতে এবং আর কোনো সামরিক তৎপরতা না চালাতে বলেছি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার কারণে উভয় পক্ষ আগ্রাসী নীতি গ্রহণ থেকে বিরত থাকে, বৈরিতা কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর নিয়মিত গোলাবর্ষণের মধ্যে সীমিত থাকে।

নাটকীয় পদক্ষেপ

তবে ভারত ও পাকিস্তানকে আলোচনা শুরু করাতে নাটকীয় কিছু করতে হয়েছিল। আর তা হয়েছিল আটক ভারতীয় পাইলট উইং কমান্ডার ভি অভিনন্দনকে মুক্তি দিতে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজি করানোর কারণে।

এ ব্যাপারে একটি ইঙ্গিত রয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি হ্যানয়ে আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিবৃতিতে।

তিনি সেদিন বলেছিলেন, আমি পাকিস্তান ও ভারতের কাছ থেকে উৎসাহব্যঞ্জক খবর পাচ্ছি।

এরপরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পার্লামেন্টে ভারতীয় পাইলটকে মুক্তি দেয়ার কথা জানান। এর ফলে ভারতের সবচেয়ে বড় দাবি পূরণ হয়ে যায়, ভারতে যুদ্ধ উন্মাদনা প্রশমিত হয়।

কার্গিল হস্তক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্র আরো বেশি ভূমিকা পালন করেছিল ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় ওই যুদ্ধে ভারত ও পাকিস্তানের প্রায় এক হাজার লোক নিহত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়ে থাকে।

কার্গিল ইস্যুতে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার শঙ্কায় ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ওয়াশিংটন ছুটে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাথে সাক্ষাত করার জন্য। যুদ্ধ বন্ধ ও কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ করেছিলেন নওয়াজ। কিন্তু বিশ্লেষক রাহুল রায় চৌধুরীর ভাষ্যানুযায়ী, ক্লিনটন তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন নওয়াজকে। তিনি বলেছিলেন, সবার আগে দরকার নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে পাকিস্তানি সৈন্য প্রত্যাহার। তিনি নওয়াজকে জানান যে ওই সময়ের পাকিস্তানি সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ তার অজ্ঞাতেই পরমাণু বোমা ফেলার পরিকল্পনা করছিলেন।

নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সৈন্য প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী এ বি বাজপেয়ি যুদ্ধ থামাতে রাজি হন।

রায়-চৌধুরী বলেন, বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রই কার্গিল সঙ্ঘাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়েছিল।

ভারতীয় পার্লামেন্টে হামলা

এরপর ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টে জৈশ-ই-মোহাম্মদের কথিত হামলার পর আবারো মার্কিন হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি হয়। ফলে আফগান যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার যোগাড় হয়। ভারত ও পাকিস্তানের ১০ লাখ লোকের সমাবেশে পরমাণু যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়।

আবারো যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার জন্য ভারত ও পাকিস্তানকে রাজি করাতে কিছু করার তাগিদ অনুভব করে। ২০০২ সালের ২৮ মে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র ইসলামাবাদ সফর করেন। তিনি পারভেজ মোশাররফকে কাশ্মীরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। পর দিন ভারতকে অনুরোধ করেন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে সংযম প্রদর্শন করার জন্য।

স্ট্র ভারতকে বলেন যে মোশাররফ অনুপ্রবেশ দমন ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী ক্যাম্পগুলো বন্ধ করে দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জুন মাসের প্রথম দিকে মার্কিন উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজ ওই অঞ্চল সফর করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল ২০০২ সালের ৩১ মে নিয়ন্ত্রণ রেখায় অনুপ্রবেশ অব্যাহত রাখার জন্য পাকিস্তানের সমালোচনা করেন। পরদিন মোশাররফ বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর্মিটেজের উপমহাদেশ ত্যাগের পরই ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দেখা যেতে থাকে।

চীন

পুলওয়ামা-পরবর্তী উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীন ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য তারা কাজটি করেছে নীরবে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নির্মাণ ও ভারতের স্বার্থের কারণে চীন এই ভূমিকা পালন করেছে।

আরো পড়ুনঃ ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ার সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছে বিজেপি?

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু ক্যাং মিডিয়াকে বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনা দূর করতে সমন্বয় সাধন ও সংলাপে বসার জন্য উভয় দেশের সাথে আন্তরিকভাবে যোগাযোগ করেছে চীন। উত্তেজনা প্রশমন ও আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীন অব্যাহতভাবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে যাবে।

রাশিয়ার মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়ে লু বলেন, আমাদের মূল অবস্থান হলো উত্তেজনা প্রশমনে গঠনমূলক প্রয়াস চালানো।

ওঝেনে রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনের পর চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ি মিডিয়াকে বলেন, ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের বন্ধু হওয়ায় আমরা আশা করি সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা নিরসন করা সম্ভব হবে।

অতীতেও ভারত-পাকিস্তান সঙ্ঘাত নিরসনে চীন ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯৯ সালে কার্গিল সঙ্ঘাতের সময় স্থিতিতাবস্থা অব্যাহত রাখার জন্য চীন আহ্বান জানায়।

একইভাবে ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর চীনা কর্মকর্তারা ‘শাটল ডিপ্লোমেসিতে’ অংশ নেন।

রাশিয়া

পুলওয়ামা ও বিমান হামলার পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন টেলিফোন করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির সাথে কথা বলেন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তাস জানায়, উত্তেজনা হ্রাস করতে মস্কো তার ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাশিয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৬৬ সালর জানুয়ারিতে রুশ প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অবসানে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্ততা করেন। তাসখন্দ চুক্তিতে সই করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রি ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাশিয়া ছিল ভারতপন্থী ও পাকিস্তানবিরোধী। এখন সে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকায় মধ্যস্ততাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ইসলামি সন্ত্রাসবাদ দমন ও আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতায় পাকিস্তানকে চায় রাশিয়া। আফগান শান্তিপ্রক্রিয়ায় মস্কো গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও রাশিয়া-চীন-ভারত ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে অনেক ব্যাপারেই চীনের সাথে সমঝোতা রয়েছে রাশিয়ার।

print
শেয়ার করুন