চার পক্ষীয় জোট নিয়ে ভারতের কেন উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত

চার পক্ষীয় জোট নিয়ে ভারতের কেন উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত

মনোজ যোশি,
শেয়ার করুন

এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনকে মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতের চার দেশীয় জোটের প্রত্যাবর্তন হয়তো প্রবাদপ্রতীম প্রহসন নয়, তবে কাছাকাছি তো অবশ্যই।

প্রথমবার এটি ব্যর্থ হওয়ার কারণ ছিল এর দুই সদস্য জোটকে এগিয়ে নেওয়াটা অস্বস্তিকর বিবেচনা করেছিল। এখন এক দশক পর যে অঞ্চলে চীনের সামরিক শক্তি সুসংহত হয়েছে, সেখানেই চার দেশীয় জোট দেশটিকে চ্যালেঞ্জ করতে যাচ্ছে, যা আবারো সোনার হরিণ হতে যাচ্ছে।

গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জোটটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হিসেবে আমাদের জানা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর চালকরা মূল্যবোধের চেয়ে জাতীয় স্বার্থই বেশি গুরুত্ব দেয়। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশাল সংগ্রামে আংশিক গণতন্ত্রী (যুক্তরাষ্ট্র), সাম্রাজ্য (যুক্তরাজ্য) এবং কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন একজোট হয়েছিল নাৎসি এবং জাপানি সমরতন্ত্রের বিরুদ্ধে।

সাধারণভাবে এটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। কারণ চার দলীয় জোট মূলত কথার দোকান, এখানে নৌমহড়া ছাড়া আর কিছুই হয় না। তবে এর সমান্তরালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বর্তমানে পরিত্যক্ত ‘পিভোট’ থেকে সরে সুদূরপ্রসারী নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। তারা নয়া দিল্লির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে একটি সামরিক জোট করা যায়। পছন্দ করুন বা না-করুন, প্যাসিফিকের মার্কিন কৌশলের সামরিক সমীকরণে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই দৃশ্যত ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে’র ধারণা অবতারণা করা হয়েছে।

ম্যানিলায় আসিয়ান বার্ষিকী এবং পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে চার দেশের নেতৃবৃন্দের প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন, তবে তাদের কর্মকর্তারা আলাদাভাবে চার দেশীয় জোট হিসেবে সভা করেছেন। তবে চীন যাতে বৈরী প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন না করে, সে ব্যাপারে তাদের সজাগ দৃষ্টি ছিল। আর চীনও এ ব্যাপারে যথেষ্ট মৃদু প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কর্মকর্তাদের সভার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘একটি পুরোপুরি উন্মুক্ত, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল দীর্ঘ মেয়াদে এই অঞ্চল এবং সার্বিকভাবে পুরো বিশ্বের সব দেশের স্বার্থ পূরণ করবে। অবশ্য ভারতীয় বিবৃতিতে কিছুটা মূর্খতা দেখা গেছে তাতে উত্তর কোরিয়ার ইস্যুটি স্থান না পাওয়ায়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানি বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়া ইস্যুটিই গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গত ২৫-২৬ অক্টোবর টিলারসনের ভারত সফরের সময় দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারিসচিব অ্যালিস ওয়েলস সঙ্গের সাংবাদিকদের বলেন, ওয়াশিংটন চার দেশীয় জোট নিয়ে শিগগিরই সভা করার কথা ভাবছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কাঠামোতে একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী দেশগুলোকে একত্রিত করার ধারণা এটি। চীনকে লক্ষ্য করে এই জোট করার কথা তিনি অস্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, লুণ্ঠনমূলক অর্থায়ন কিংবা অ-টেকসই ঋণের (পড়–ন: চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ) বদলে অবকাঠামো উন্নয়ন কামনাকারী দেশগুলোর মধ্যে ‘সমন্বিত’ প্রয়াস চালানোর কথা বলেন।

এর কয়েক দিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো ফোরামটি পুনর্জীবনের প্রস্তাব করেন। তিনি জানান যে তিনি এ নিয়ে টিলারসন এবং অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপের সাথে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সামুদ্রিক জোন প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য। এর মানে হলো অস্ট্রেলিয়াকে কিছু সময় ধরে সক্রিয় যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-ভারত ত্রিদেশীয় জোটে শরিক করা।

জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর চীনের সাথে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমবারের মতো আইডিয়াটি সামনে এনেছিলেন। ২০০৪-০৫ সালে চীনে জাপান-বিরোধী বিক্ষোভে টোকিও বেশ কষ্ট পায়। ধারণা করা হচ্ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের ওপর জাপান যে নৃশংসতা চালিয়েছিল, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে চীনের প্রতি জাপানের বিপুল সহায়তা এবং বিপুল বাণিজ্যের কারণে ওই বৈরিতার অবসান ঘটেছে। আসলে চীন সময়ের অপেক্ষা করছিল।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতি অনুসরণ করে তার নৌশক্তির প্রায় ৬০ ভাগ এই অঞ্চলে মোতায়েন করে। যুক্তরাষ্ট্র ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপও (টিপিপি) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। চার দেশীয় জোটের সূচনা এবং এশিয়া-প্যাসিফিককে ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে’ পরিণত করা সত্ত্বেও ট্রাম্প তার নীতি কিভাবে কার্যকর করবেন তা স্পষ্ট নয়। এর মানে কি দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য আরো শক্তি প্রদর্শিত হবে? এটি ওবামার ‘পিভট’ থেকে কতটা ভিন্ন হবে?

প্রথমবার যখন প্রচার করা হয়েছিল, তখন চার দেশীয় জোটের ব্যাপারে বাস্তব কারণেই সংশয়ে ছিল ভারত। এখন ওই প্রস্তাবটি নতুন করে আসায় তারা এ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। সদ্য নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর অ্যাবের জাপান প্রতিরক্ষা, সাগর নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। টিলারসনও আভাস দিয়েছেন, চার দেশীয় জোট প্রতিদ্বন্দ্বী কানেকটিভিটি প্রকল্প বিকশিত করবে, এবং এমন অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাবে যা লুণ্ঠনমূলক হবে না, আবার অটেকসইও হবে না।

চার দেশীয় জোট গড়ার প্রথম উদ্যোগটি ভণ্ডুল হয়েছিল প্রথমে অস্ট্রেলিয়া রাজি না হওয়ায় এবং ভারতেরও একই অবস্থান গ্রহণ করায়। ঠিক ওই সময়টাতেই কাকতালীয়ভাবে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ওই সময় চীনা অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা হয়, দেশটির সামরিক শক্তিও বেশ বাড়তে থাকে।

অনেকের অভিমত, চীন এখন এতই বড় হয়ে গেছে যে তাকে আর সংযত করা যাবে না। তবে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রকৃতিকে বাতিল করে দেয় না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্মিলিত অর্জন নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। আর মূল্যবোধ ও নীতিমালার চেয়ে জাতীয় স্বার্থসিদ্ধিই গুরুত্ব পেয়ে থাকে। জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া যা-ই বলুক না কেন, এখন খেলার নাম চীনকে সংযত করা। এটা বিশেষ কোনো খারাপ ব্যাপার নয়। চীন কিন্তু নিজেকে শান্তিপূর্ণ কিংবা সংযত দেশ হিসেবে পরিচিত করছে না। দোকলাম ইস্যুতে ভুটানের প্রতি, থাড মোতায়েন নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে শাস্তি প্রদান, সমুদ্রসীমা নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে চীন।

প্রশ্ন হলো, চার দেশীয় জোটটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে সৎ মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে এবং ওই মূল্যায়নের ব্যাপারে সব দেশ আন্তরিক কিনা। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস সবার জানা। ১৯৮০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী পল কিটিংকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জাপান-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ হলে তিনি কার পক্ষ নেবেন। তিনি জাপানের কথা বলেন। জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন একই যুক্তি খাটে চীনের ব্যাপারে। চার দেশীয় জোটের অন্যান্য দেশের চেয়ে চীনের ওপরই অস্ট্রেলিয়া অনেক বেশি নির্ভরশীল। আর জাপান এখনো অনেকটাই ‘শান্তির’ নীতিতে বিশ্বাসী। ফলে অ্যাবের বিদায়ের পরপরই তারা অবস্থান বদলাতে পারে।

অনেক দিক থেকেই ভারত ও জাপান মুখোমুখি রয়েছে চীনের। কিন্তু বিরোধ মীমাংসায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হলে কি চার দেশীয় জোট একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে? আসলে পূর্ব চীন ও জাপান সাগরের ঘটনাবলী থেকে চোখ সরানো জাপানের জন্য কঠিন।

আর যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টি কি? তার সব কথা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নিয়ে। আরব সাগর কিংবা পারস্য উপসাগরের সাথে সম্পর্কি কোনো ইস্যুতে সে ভারতের সাথে আলোচনা করতে নারাজ। অথচ ভারতের জন্য এ দুটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অর্থাৎ ইন্দো-প্যাসিফিকের মানে হলো প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি ভারতের সামরিক প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কিত ভারতের উদ্বেগজনক ইস্যু এবং পারস্য উপসাগরের অতি উত্তপ্ত বিষয়াদিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।

বৃহত্তর ইস্যুও আছে। মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘আমেরিকান ফার্স্ট’ পাগলামির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। আর চীন পরবর্তী ৩০ বছরের জন্য তার উচ্চাভিলাষী নীতি ঘোষণা করেছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি বৈশ্বিক উদ্ভাবন নেতা এবং দেশ থেকে দারিদ্র পুরোপুরি নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ সার্বিকভাবে বৈশ্বিক নেতা এবং ‘মহান আধুনিক সমাজবাদী দেশ’ হওয়ার টার্গেটও গ্রহণ করেছে। এই মহা পরিকল্পনা বাস্তাবয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মডেলের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে বহুদলীয় উদার গণতান্ত্রিক মডেলের বিপরীতে এক দলীয় স্বৈরতান্ত্রিক দেশের মডেলকে বেছে নিয়েছে।

চীনকে একমাত্র যে শক্তি কার্যরকভাবে মোকাবিলা করতে পারে, সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এ দেশটি কোন দিকে যাচ্ছে তা বিশ্ব জানে না। এমনকি বিপুল সম্পদ ও সামর্থ্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি তেমন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করছে না। চীনকে যেমন ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী ভঙ্গিমায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন মনে হচ্ছে না। বরং আমেরিকা কী এবং কারা তা নিয়ে প্রায় সহিংস সঙ্ঘাত চলছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সাথে ভারসাম্য বিধানে কার্যকর নেতৃত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করাটা হবে বিপজ্জনক বিষয়।

 

লেখক: ডিস্টিংগুইশ ফেলো, অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন।

print
শেয়ার করুন