গুরুতর বার্তা দিচ্ছে তালেবানদের নাইট গগলস

গুরুতর বার্তা দিচ্ছে তালেবানদের নাইট গগলস

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আফগান কৌশলের লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে আফগান তালেবানকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করা, তবে সাম্প্রতিক একের পর এক সুচারু আক্রমণ প্রমাণ করেছে, এই কৌশল কেবল ব্যর্থই হয়নি, বরং হিতে বিপরীতও হয়েছে। মনে হচ্ছে, তালেবান আরো অত্যাধুনিক হয়ে ওঠেছে, আগের চেয়ে আরো ভালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ওঠেছে।

এ ধরনের সহিংসতা ও রক্তপাত সংশয়াতীতভাবে এই সাক্ষী দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত এই যুদ্ধটি শিগগিরই শেষ হচ্ছে না। বরং ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখন এই ধারণাই সৃষ্টি করছে, এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানকে সমর্থনকারী এবং আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতির বিরোধিতাকারী রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত শক্তিগুলোর মধ্যে প্রক্সি যুদ্ধে পরিণত হতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যাপক সহিংসতার ফলে এটা থামাতে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর অক্ষমতাই প্রকাশ করছে। এতে করে উন্নয়ন কর্মসূচির সামর্থ্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

তুর্কমেনিস্তানে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আফগানিস্তানবিষয়ক ৭ম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলন ছিল আফগানিস্তানের জন্য ভালো কিছু দেওয়ার একটি চমৎকার সুযোগ। একইসাথে এটাও মনে রাখতে হবে, আগের ছয় রাউন্ড সম্মেলন, হার্ট অব এশিয়া কনফারেন্সের মতো সম্মেলনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও এবারেরটি অনুষ্ঠিত হলো। লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ হলো যুদ্ধ অব্যাহতই থাকেনি, বরং তা আরো তীব্র হয়েছে।

অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, এটি এবং এ ধরনের অন্যান্য ফোরামকে ব্যবহার করতে পারলে আঞ্চলিক দেশগুলোর আফগানিস্তান থেকে সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়। অন্যদিকে আফগানিস্তানের বাস্তব অবস্থা বলে দিচ্ছে, আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্পৃক্ততার গতিশীলতা মৌলিকভাবে বদলে গেছে।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, গত সোম ও মঙ্গলবার ৩৬ ঘণ্টা সময়ে হওয়া সর্বশেষ হামলাটি যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কথা বলছে। সর্বশেষ এসব আক্রমণে তালেবান হামলাকারীরা সরকারি বাহিনীর চেয়ে (অন্তত আফগান পুলিশ বাহিনীর চেয়ে) উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। এই দুই হামলায় আফগান পুলিশই সবচেয়ে বেশি হতাহতের শিকার হয়েছে।

কান্দাহার প্রদেশের গভর্নরের মুখপাত্র কুদরাতুল্লাহ খুশবখতের ভাষ্যানুযায়ী, তালেবানের লাল ইউনিটগুলোর ‘নিজস্ব মোবাইল বিশেষ ইউনিট রয়েছে। তারা লেসার ও নাইট-ভিশন সরঞ্জাম ব্যবহার করে। তারা চেক পোস্ট ও ঘাঁটিতে হামলা করার পর যত দ্রুত সম্ভব কেটে পড়ে, যাতে বিমান হামলার মুখে পড়তে না হয় তাদের।’

এমন সব ঘটনার মধ্যে আসল যে প্রশ্নটি অনেকেই জিজ্ঞাসা করছে তা হলো: কারা তালেবানকে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিচ্ছে?

মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করছে, নাইট-ভিশন গগলসগুলো রাশিয়ার তৈরি। অনেক খবরে বলা হচ্ছে, তালেবান বাহিনী কালোবাজার থেকে এগুলো সংগ্রহ করছে। তাহলে প্রশ্ন জগে, এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করাটা তাদের কারা শেখাচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাব অজানা থেকে গেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কিছু সামরিক প্রশিক্ষকের সহায়তা ছাড়া এমনটা হতে পারে না।

এই প্রশ্নের জবাব সুস্পষ্টভাবে দেওয়া সম্ভব না হলেও একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার তা হলো, তালেবান আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে, আফগানিস্তানবিষয়ক ট্রাম্পের নতুন কৌশল এর ফলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা আরো কমছে।

তাছাড়া তালেবানের ‘বিশেষ বাহিনী ইউনিট’ এবারই এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করছে, এমন নয়। মার্কিন বাহিনী না জানলেও সেই ২০১৬ সালের প্রথম দিকেও তালেবান বাহিনী এ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করত বলে ওয়াশিংটন পোস্টে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এখন বাস্তবতা হলো, সহিংসতা বাড়ছে এবং উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো কোনোভাবেই আফগানিস্তানের অনুকূলে কাজ করছে না। এতে আরো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, শান্তি আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। আফগান তালেবান তা জানে এবং সে অনুযায়ী তারা কাজ করছে।

তালেবান ছাড়াও আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোও বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দৃশ্যমান শান্তি পরিকল্পনা নেই। আর এ কারণেই রাশিয়া, চীন, ইরান ও আফগানিস্তানের মতো দেশ নিজস্ব ধরনের শান্তির অন্বেষণ করছে।

অবশ্য এ ধরনের পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত মার্কিন সমর্থন আদায় করতে পারেনি। বরং এক ভাষ্যকার এমনও বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজে থেকে শান্তি আনতে না পারলেও অন্যরাও যাতে না-পারে, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশটির কোনো শান্তি পরিকল্পনা নেই। কিন্তু তবুও সে অন্য কাউকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে দেবে না।’

আসলে যুক্তরাষ্ট্র যা চাইছে তা হলো ‘বিমান শক্তির সুনামি’ ঘটাতে। কিন্তু তা করার জন্য অনেক বছর লাগবে। সত্যিকার অর্থে হামলার ফলে কী প্রভাব পড়ে এবং তাতে আফগান বাহিনী সুবিধা পাবে কিনা সেই বিষয়টি না হয় নাই বলা হলো। মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষকদের মতে, ২০২২ সালের আগে ১৫৯টি চপারের পূর্ণাঙ্গ বহর আফগানিস্তানে পাঠানো এবং তাতে লোক প্রদান করা সম্ভব হবে না। আর হামলার জন্য অস্ত্রে সজ্জিত করা হবে মাত্র ৫৮টি। এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে, আগামী বসন্তে হামলার মওসুমে হামলার মিশনে পাঠানোর জন্য মাত্র চারজন আফগান ফ্লাইট ক্রুকে তৈরি করা যাবে। আর ২০১৯ সাল নাগাদ ৩২টি দল এবং ব্ল্যাক হক তৈরি হবে।

গত ১৬ বছর পর্যন্ত আমরা যা দেখছি, সেটাই তখন পর্যন্ত আমরা দেখতে থাকব। কী দেখছি আমরা: প্রচুর যুদ্ধ এবং প্রাণহানি, সম্পত্তির ক্ষতি। আর তা হচ্ছে কেবল শান্তি আলোচনা না হওয়ার কারণে।

print
শেয়ার করুন